বসন্ত **** রব গর্গ।

বসন্ত

রব গর্গ।
——-

শীত কাল প্রায় শেষ হয়ে এল…
খোয়াইএর দিক থেকে হাল্কা একটা বাতাস আসছে।
বাটিকের কাজ করা একটা চাদর গায়ের উপর, ভোরের ঘুমের ওম সারা শরীরে মেখে নিচ্ছে নন্দিনী।
শাল গাছের ফুল ঝরে পরছে ভুবনডাঙার বাড়িটার চার দিকে।
গোটা কয়েক শালিখ তার মধ্যে লাফিয়ে লাফিয়ে খেলা করছে,যেন নেচে নেচে বেড়াচ্ছে।
গুরুপল্লী থেকে ভাবগম্ভীর প্রার্থনা সংগীত ভেসে আসছে…
শান্তিনিকেতনের আর একটা দিন শুরু হল।

এমন সময় কানে এলো কে যেন ডাকছে ওর নাম ধরে….
নন্দিনী,নন্দিনী…নন্দিনী…….
নন্দিনী আমি বসন্ত,চোখ খুলে দেখ আমি এসেছি তোমার কাছে।
গত বার বলে গিয়েছিলাম না,ঠিক সময় মতো ফিরে আসবো?
নন্দিনীর সারা শরীর চনমন করে ওঠে…
তীব্র গ্রীষ্ম,অঝোর ধারার বর্ষা, উৎসব-মুখর শরৎ, ছোট্ট হেমন্ত, আর নাকাল করা শীত পার করে এত দিন পর সে এল!
নন্দিনী প্রথমে ভাবছিল যে সে স্বপ্ন দেখছে।
প্রার্থনা সংগীত কানে এল যেই দূর থেকে তখন মনে হল যে এটা তো স্বপ্ন নয়!
তাই তো!
প্রান ভরে ঘ্রাণ নিল নন্দিনী……..
এই ভাবেই তো সে চেনে তার চারপাশের সব কিছুকে।
হ্যাঁ,এই তো সেই চেনা গন্ধটা!
তার প্রাণ-প্রিয় বসন্ত এসে গেছে…..
নন্দিনী নিজের সমস্ত সত্তা দিয়ে বসন্ত কে অনুভব করতে থাকে!
একটা ইন্দ্রিয় হয়তো কম আছে ওর কিন্তু তাতে কোন কিছুই কম মনে হয় না……

একাই উঠে যায় বিছানা থেকে,ওয়াকিং স্টিক টা নিয়ে জানলার কাছে এসে দাঁড়ায়।
সান-শেড থেকে ঝুলিয়ে দেওয়া একটা টবে সবুজ হয়ে ঝুলছিল একটা গ্রেপ-আইভি লতা।
হাল্কা ভাবে হাত বুলিয়ে দেয় নিন্দিনী ওর উপর।
পাতায় জমে থাকা শিশিরে আঙুল গুলো ভিজে গেলে,নিজের কপালে,গালে,গলায় মাখিয়ে নেয় সেগুলো।
প্রভাত সুর্যের হাল্কা একটা কিরণ এসে পড়ে ওর মুখে।
একটা অদ্ভুত আনন্দে ভরে ওঠে নন্দিনীর মুখ…
প্রকৃতিও যেন বিস্মিত হয়ে দেখতে থাকে ওর সৌন্দর্য।
আজ এই মুহূর্তে নন্দিনীই যেন প্রকৃতি, প্রকৃতিই যেন নন্দিনী!
নন্দিনীর নিজের কানে যেন ভেসে আসছে ভালবাসা মাখা তার প্রিয় সেই গান টা,
ভালবেসে সখী নিভৃতে যতনে আমার নাম টি লিখো তোমার মনের মন্দিরে…..
যেন তার পরম প্রিয় বসন্ত তাকে উদ্দেশ্য করেই গাইছে…
আমার পরানে যে গান বাজিছে
তাহার তালটি শিখো—
তোমার চরণমঞ্জীরে….
একাত্ম হয়ে যায় নন্দিনী,
বসন্তের সাথে নিজেকে মিশিয়ে নিতে চাইছে সে প্রথম ফাল্গুনের এই শুভ-লগ্নে!
খুব স্বাভাবিক ভাবে নন্দিনীর মুখ থেকে বেরিয়ে আসে গানের পরের অংশ….
ধরিয়া রাখিয়ো সোহাগে আদরে,
আমার মুখর পাখী….. তোমার
প্রাসাদ প্রাঙ্গণে..
ভালোবেসে সখী,নিভৃতে যতনে
আমার নামটি লিখো —-তোমার
মনের মন্দিরে….”

রব গর্গ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *