সূর্য শিশির। কলমে-ছন্দা চট্টোপাধ্যায়।

ধারাবাহিক।
সূর্য শিশির।
কলমে-ছন্দা চট্টোপাধ্যায়।
পর্ব-৩।
-‘আমি বারবার প্রেমে পড়ি জানেন স্যার? আমার শিরায় শিরায় ধমনীতে চাঁদের ঢেউ বয়ে যায়।’- দেবর্ষির কাঁধে মাথা রাখে মধুরা। দেবর্ষি তার মোটা কাঁচের চশমার ফাঁক দিয়ে দৃষ্টি ভাসিয়ে দেয় সামনের উঁচুনিচু পাহাড়ের দিকে। অসহ্য জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে রুক্ষ মাটির প্রকৃতি। পাহাড়ের পাদদেশে ঘনিয়ে ওঠা আহ্লাদী অন্ধকারে মুঠো মুঠো জোনাকিরা উল্লাসে হল্লা করছে। দেবর্ষির মধ্য পঞ্চাশের শরীর বড়ো হাহাকার করে। ঐ একলা জ্যোৎস্নার মতো,ঐ দিগন্তের গায়ে লেগে থাকা কালচে পাহাড়ের স্যিলুয়েটের মতো।মধুরার গভীর কাজলমাখা চোখ দুটোয় চাঁদের ছায়া কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছে দেবর্ষির বুকের মধ্যে। বহুদিন নারীসঙ্গ বঞ্চিত পুরুষ এই নির্জন বনভূমিতে যেন এক রক্তলোলুপ হায়না। দেবর্ষি অনুভব করে নারীর নিজস্ব সুবাস কখনও পুষ্পগন্ধী নয়।নারী সুবাসিত তার আঁষটে রজস্বলাজনিত বুনো গন্ধে।মৎস্যগন্ধা যেমন টেনেছিল পরাশর মুনিকে তেমনই বড্ডো টানছে আজ কুহকিনী মধুরা।
চাঁদের আলোয় মধুরার লাল লিপস্টিক মাখানো ঠোঁট খয়েরী হয়ে আছে। ইষৎ ফাঁক ঠোঁটের ভেতরে কুন্দ দন্তে চন্দ্রালোক ঠিকরে উঠছে মুক্তোর মতো। তার এলোমেলো চুলে খেলে যাচ্ছে বুনো বাতাস। বুনো বাতাসের মতো এলোমেলো হয়ে যায় দেবর্ষির বুকের মধ্যেটা। আদিম পুরুষটা বেরিয়ে আসে,সারা অবয়বে নিকোটিনের কটু গন্ধের মতো উগ্রতা ছড়িয়ে পড়ে। একজন রুচিশীল,সভ্য মানুষের অন্তর্সত্ত্বাকে নির্মমভাবে দখল করে বিপর্যস্ত করে দেয়। নারী ঠোঁট টিপে বলে-‘খুব বেশী পুরুষ হও। উগ্র হও।আদর করতে গিয়ে কাঁদো কেন? ‘- আশ্লেষে চোখের জল গড়িয়ে পড়ে দেবর্ষির, মনে পড়ে রোগশয্যায় শায়িতা পঙ্গু স্ত্রী বিপাশার কথা, অপরাধবোধে দীর্ণ হয় দেবর্ষি। মধুরার চোখে চাঁদের আলো আগুন ধরিয়ে দেয়। বিকীর্ণকামা নারী ভালোবাসার আক্রোশে ফুঁসে ওঠে, ঝাঁপিয়ে পড়ে, অবশেষে অজগরের মত করাল গ্রাসে নিজের অভ্যন্তরে গ্রহণ করে।
-‘স্যার, বলছিলাম না, আমি বারবার প্রেমে পড়ি! কেন জানেন, একবারে কেউ আমাকে তৃপ্ত করতে পারে না। এই তো আপনি,কেমন সুন্দর ম্যানেজ করলেন! তবু চোখে জল এলো তো দিদির কথা ভেবে ‘- দেবর্ষি অবাক হয়, -‘দিদি মানে! কার কথা বলছো?’- -‘বাঃ রে, আপনার বৌ, আমার বড়ো সতীন তো! দিদি বলেই মানি তো তাঁকে।’- পাথরের চট্টানটায় একপাক গড়িয়ে নেয় মধুরা। নদীর তীরে জঙ্গলের এই হোমস্টেতে মাঝে মাঝেই দেবর্ষি একলা যাপন করতে আসে। মধুরা এবার কায়দা করে জেনে নিয়েছিল দেবর্ষি কোথায় যাচ্ছে। একদিন আগেই চুপচাপ এসে বসেছিল। শতমন্যুকে তো জানানোর প্রয়োজন নেই। আয়াকে বলে এসেছিলো, কোনো দরকারে তাকে বাইরে যেতে হচ্ছে। দাদাবাবু আর বাচ্চাকে সে যেন যত্ন করে দেখে রাখে। দুদিন পরে সে ফিরবে।
দেবর্ষি বলে -‘ঘরে চলো। বাইরে বেশ ঠাণ্ডা। তা ছাড়া বুনো জন্তু জানোয়ারের ভয় তো আছে।’- মধুরা খিলখিলিয়ে হাসতে থাকে। -‘এসেছিলো তো স্যার! আমাদের ঐ অবস্থায় দেখে লজ্জা পেয়ে পালিয়ে গেছে।’-
আপনি নিজেই বলুন স্যার, আপনি তৃপ্ত হননি? আপনি অস্বীকার করতে পারবেন, এই রাত আগে কখনও আসেনি আপনার জীবনে। স্যার, একটাই তো জীবন! আমি আপনাকে সুখ দিয়ে সুখী।সারা জীবন এই রাত ভুলবো না আমরা কেউ। শুধু দিদি বা শতমন্যুর কথা উহ্যই থাক না।’- দেবর্ষি স্বচ্ছন্দে কোলে তুলে নেয় মধুরার ইষৎ ভারী শরীরটা। চাঁদের হাসিটা আজ বড়ো নির্লজ্জ, লম্পটের মতো। দেবর্ষি হোমস্টের নির্দিষ্ট রুমে ঢুকে পড়ে। আজ তারা সারা রাত জেগে থাকবে। কাল ট্রেন ধরে সোজা কোলকাতা। আবার গতানুগতিক জীবন। কোনো অপরাধবোধ তাই আর কাজ করে না। এমন তো চালানোই যায়। কারো কোনো ক্ষতি তো হচ্ছে না।আসলে মানুষ নিজেই বোঝে তার কোন্ কাজটা ঠিক,কোনটা ভুল। তাই কাজের স্বপক্ষে যুক্তি খাড়া করে যেন দায় ঝেড়ে ফেলে।
চলুক, জীবন তো বহতা নদীর মতো। ভালোবেসে এও তো একরকম আত্মরতি। যখন সমাজের অনুমোদিত নিজস্ব কক্ষে একলা বিছানা কন্টকশয্যা মনে হবে সেদিন তো এই দিনটার স্মরণে একটু শান্তি পাওয়া যাবে। আবার দুজনে দুজনের মধ্যে মগ্ন হয়ে যায়।হৃদয় দিয়ে অনুভব করে এই জংলী ভালোবাসাকে। জানলা দিয়ে এক ঝলক বাতাস বুনো ফুলের উগ্রতা ছড়িয়ে দেয়। পরস্পর পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে নরনারী।