স্বর্গ থেকে হোলির নির্দেশিকা ✍️ রাজা চক্রবর্তী

স্বর্গ থেকে হোলির নির্দেশিকা
✍️ রাজা চক্রবর্তী

স্বর্গলোকে হঠাৎ হৈচৈ শুরু হয়েছে। দেবরাজ ইন্দ্রের বিশেষ আহ্বানে বসেছে এক জরুরি সভা, কারণ সামনে আসছে হোলি। সভার সভাপতি শ্রীকৃষ্ণ, যিনি নিজেই হোলির ধারক-বাহক। সভায় উপস্থিত সব দেব-দেবীরা একে একে আসন গ্রহণ করলেন।

শ্রীকৃষ্ণ কণ্ঠ পরিস্কার করে বললেন, “এই হোলিতে কিছু নিয়ম কঠোরভাবে মানতে হবে। গতবার কেউ কেউ রঙের নামে যাচ্ছ তাই করেছেন, তা স্বর্গ মর্তের পরিবেশের জন্য মোটেও মানানসই নয়। এবার যদি কেউ দুষ্টুমি করেন, তাকে যথাযথ শাস্তি পেতে হবে!”

দেবতাদের মধ্যে ফিসফিস শুরু হয়ে গেল। ইয়ং প্রেমিক প্রেমিকা দেব দেবীরা একে অন্যের মুখের দিকে চাইছে, ইশারা ইঙ্গিতে, হাসি দিচ্ছে দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে। বিশেষ করে কামদেব, যিনি হোলির প্রেমময় আবহকে একটু বাড়িয়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তিনি কথাগুলো শুনে একটু ঠান্ডা হয়ে গেলে, আস্তে করে বললেন, “কিন্তু প্রেমের রঙ না থাকলে হোলির আনন্দ কোথায়?”

শ্রীকৃষ্ণ হেসে বললেন, কামদেব তুমি থাকবে, প্রেম থাকবে, তবে সীমার মধ্যে।”

এরপর নিয়ম ঘোষণা করা হলো—
১. ফুলের পাপড়ি থেকে তৈরি রঙ ছাড়া অন্য কোনো রঙ ব্যবহার করা যাবে না। কেমিক্যাল রঙ একেবারে নিষিদ্ধ! যদি কেউ ব্যবহার করেন, তবে সেই দেবতাকে এক মাস ধরে ইন্দ্রলোকে কারাগারে থাকতে হবে।
২. কোনো দেবতা দেবীদের অনুমতি ছাড়া রং মাখাতে পারবেন না। গতবার নারদের গায়ে যখন উর্বশী ভুল করে রং লাগিয়ে দিয়েছিলেন, তখন যে তুলকালাম কাণ্ড হয়েছিল, তা যেন এবার না হয়!
3. কাদামাটি নিষিদ্ধ! মহাদেবের জটা থেকে গঙ্গা স্বয়ং সতর্ক করে দিয়েছেন, কাদা ব্যবহার করলে তিনি কৈলাস থেকে জলস্রোত বন্ধ করে দেবেন। তখন দেব দেবীদের গায়ে মাখা রং ধোবে কি করি? সেটা মাথায় রেখে কাদামাটি নিষিদ্ধ।

শিবজি তখন ধ্যানে বসে ছিলেন। নিয়ম শুনে এক চোখ খুলে বললেন, “আমি তো সবসময় ভস্ম মাখি, তবে আমার কি হবে?

শ্রীকৃষ্ণ হাসলেন, “ভস্ম তো রং নয় মহাদেব! তবে রং খেলার দিন পার্বতীজির অনুমতি পেলে মাখতেই পারেন, তার আগেই নয়।”

এই কথা শুনে পার্বতী মুচকি হেসে শিবের দিকে তাকালেন, আর শিবজি একগাল হেসে বললেন, “তাহলে তো বেঁচে গেলাম!”

ইন্দ্র দেবের মনে একটু সন্দেহ হলো। তিনি বললেন, “কিন্তু যদি কেউ লুকিয়ে নিয়ম ভাঙে?”

শ্রীকৃষ্ণ বললেন, “তাহলে স্বয়ং যমরাজ ব্যবস্থা নেবেন। তবে আমরা চাই না, হোলির আনন্দ, ভয়ের কারণে কমে যাক। তাই প্রেমের রঙ হোক সৌন্দর্যের সঙ্গে।
শ্রীকৃষ্ণ এও বলেন, তবে হ্যাঁ, ভয় শুধু কামদেবকে নিয়ে, কামদেব, আপনাকে আবারো বলছি, আপনি নিজেকে সামলে চলবেন। রঙের খেলায় মশগুল হয়ে স্বর্গ মর্ত্য পাতালে কোন দেব-দেবী, নর নারী, অথবা অসুর অসুরি, কাউকে নিয়ে বেশি মাখামাখি করবেন না। তাদের মনের বাড়িতে চা খেতে বসবেন না।,
বেশি গল্প করবেন না, আপনাকে সবাই আমন্ত্রণ জানাবে, লাঞ্চে আসুন ডিনারে আসুন ব্রেকফাস্ট খান আপনি এসব কিছু করবেন না।
আপনাকে কিন্তু বারবার সতর্ক করে দিলাম।

সবাই মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন।

ভোলেনাথ তৃতীয় ইন্দ্র খুলে দেখলে, তার কিছু ভাং ও গঞ্জ সাধন মাতাল ভক্ত ও কাম দেবতার সঙ্গে অনেক দিনের বন্ধুত্ব করা কিছু ভক্তরা, মনে মনে একটু ক্ষুন্ন হলেন। ভোলানাথ মুচকি হেসে আবার চোখ বন্ধ করলেন। বুঝিয়ে দিলেন সংযম জীবনের একটা অংশ।

এই নিয়ম মর্ত্যেও পাঠিয়ে দেওয়া হলো। কিন্তু মানুষ, সেতো ভগবানের এক ডিগ্রি উপরে, শুনবে কি?

বৃন্দাবনে তখন রাধা-কৃষ্ণের হোলি খেলা চলছিল। রাধা হাসিমুখে কৃষ্ণকে বললেন, “এই নিয়ম কি তোমার জন্যও প্রযোজ্য?”

শ্রীকৃষ্ণ কৌশলী হাসলেন, “আমার ক্ষেত্রে নিয়ম একটু আলাদা! তবে তোমার অনুমতি ছাড়া রং ছুঁবো না।”

রাধা খিলখিল করে হেসে বললেন, “তাহলে আমি প্রথমে তোমাকেই মাখিয়ে দিই!”

এই বলে তিনি কৃষ্ণের গালে এক মুঠো ফুলের রং ছুঁড়ে দিলেন। কৃষ্ণ মৃদু হাসলেন, “এটাই তো হোলির আসল মজা—প্রেমের রঙে রাঙানো!”

নারদ মুনি দূর থেকে সব দেখলেন আর বললেন, “নারায়ণ, নারায়ণ! প্রেমের রং তো নিষিদ্ধ নয়!”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *