প্রায়শ্চিত্ত #মৌসুমি

প্রায়শ্চিত্ত

#মৌসুমি

“তোমার একঘন্টা হয়ে গেছে বাবু, এবার ওঠো”।। সৌরভ তখনও ঘোরের মধ্যে। চাহিদা সকলের আলাদা আলাদা।। কেউ অল্পতেই তৃপ্ত কেউ হয়তো আরও বেশি।। শিউলির হাতটা ধরে টেনে নিজের বুকের ওপরে এনে দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে বলল,”ভালবাসায় আবার সময় হয় নাকি,বোকা মেয়ে।।” শিউলি সৌরভের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে বলল”এই গলিতে ভালবাসার কোন জায়গা নেই বাবু।।বাজে বকো না। তুমি যাও,একটু পরেই ভোর হবে।‌আমার অন্য কাজ আছে।।মাসি বলেছিল তুমি একঘন্টা সময় নেবে।।আর একঘন্টা হয়ে গেছে।। তুমি যাবে নাকি আমাকে জোর করে বের করতে হবে,।।”

সৌরভ বিছানা ছেড়ে উঠে শার্ট পরতে পরতে বলল,”থাক ভয় দেখাতে হবে না।।এমনিও আমি ওই সব লোকেদের ভয় পাইনা।। তুমি চাইছো না চলে যাচ্ছি, কিন্তু কাল রাতে আবার আসবো,রোজ আসবো।। এই ঘরে এখন থেকে আমি ছাড়া কেউ থাকবে না রাতে, তার জন্য যত টাকা লাগে দেবো, কিন্তু কাউকে ঢুকতে দেবো না “।। শিউলি হেসে উঠলো সৌরভের কথা শুনে।।”নিজেকে হিন্দি সিনেমার নায়ক ভেবো না।।চল বেরোও এখন।।” ঘর থেকে বেরনোর আগে শিউলি কে দেয়ালে ঠেসে দু হাত ধরে বলল,”তোর ওই চোখ দুটো আমাকে অস্থির করে শিউলি।। চলে যাচ্ছি।।”

পরেরদিন সন্ধ্যায় বাইরে বচসা শুনে শিউলি জানলার বাইরে উঁকি দিয়ে দেখে সৌরভের সাথে মাসির ঝামেলা হচ্ছে।।”অন্য কোন ঘরে যা বাবু।।রোজ রোজ একজনের ঘরে হবে না “।।এসব বাজে কথা ছাড়ো মাসি আমার শিউলি কে প্রয়োজন”।। সৌরভের এমন জোড়াজোরি তে মাসি শিউলির ঘরে যেতে দিলো। এমনভাবেই অনেকগুলো মাস কেটে গেল সৌরভ নিয়মিত আসতো শিউলির ঘরে।। একদিন অন্তরঙ্গ মুহূর্তে সৌরভ শিউলি কে বলে “তোকে আমি বিয়ে করবো শিউলি”।। শিউলি নিজেকে সৌরভের থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে হোহো করে হেসে বলল,”এই গলিতে সবাই বিয়ের কথা বলে হারিয়ে যায়।।”

সৌরভ শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতেই বলল”আমি আসবো, নিয়ে যাবো এখান থেকে “।। তারপর এক সপ্তাহ সৌরভ আর আসেনি শিউলির কাছে।। শিউলি জানতো সৌরভ আর কখনো আসবে না। তাকে সারাজীবন তার মায়ের মতো ওই অন্ধকার জগতেই কাটিয়ে দিতে হবে।। কিন্তু এক সপ্তাহ পরে চাঁপা এসে শিউলি কে বলে”শিউলি তুই সেজে নে।।তোর সৌরভ বাবু তোকে মুন্নির থেকে পুরোপুরি কিনে নিয়েছে অনেক টাকা দিয়ে “।।কথাটা শুনে শিউলির মনে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল।। তারপরই সৌরভ ঘরে এসে বলে”তৈরি হয়ে নে শিউলি।। বলেছিলাম নিয়ে যাবো।। পুলিশ নিয়ে এসেছি সঙ্গে করে।।কেউ কিছু করবে না “।।

শিউলি কে সেখান থেকে বের করে নিয়ে সোজা গাড়ি চলল হাওড়া স্টেশনের দিকে।। হাওড়া থেকে নিজের বাড়ি জলপাইগুড়ি।। বাড়ির সামনে আসতেই একজন মধ্যবয়স্কা ভদ্রমহিলা দরজা খুলল।। ওনাকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন ওদের অপেক্ষায় ছিল।। সৌরভ পরিচয় করিয়ে দিলো”আমার মা শিউলি।”শিউলি গায়ে কাপড় জড়িয়ে সৌরভের মা কে প্রণাম করলো।। শিউলি কে আশীর্বাদ করে বললেন”আজ থেকে তোমার নাম পর্ণা। শিউলি নয়।। আমি বাবুর থেকে সব শুনেছি।। তুমি স্নান সেরে বিশ্রাম নাও সন্ধ্যার সময় কথা বলবো “।।

সন্ধ্যাবেলা কফি নিয়ে সৌরভের মা শিউলির ঘরে এলো।।বেশ খানিকক্ষণ কথার পর বলল,”পর্ণা আমি জানি তোমার অতীত।।সবটা ভুলে গিয়ে বর্তমানে বাঁচো।। আগামীকাল মন্দিরে তোমাদের বিয়েটা দিয়ে দেবো।। তুমি সকাল সকাল স্নান সেরে তৈরি হয়ে নিও।” পরেরদিন সকালে শিউলি ওর মায়ের দেওয়া শাড়িটা পরলো।।ব্যাগ থেকে ওর মায়ের গলার হার সাথে A লেখা লকেটটা পরলো।। নিজেকে আয়নায় প্রথমবার ওর ভালো লাগছিল।। মনে হচ্ছিল যেন নিজের প্রেমে নিজেই পরবে বারেবারে।।

শিউলি সৌরভের মায়ের সামনে দাঁড়াতেই চমকে উঠলেন অসীমা দেবী।।” এই লকেটটা তুমি কোথায় পেলে?কে দিয়েছে তোমাকে।” শিউলি আস্তে করে বলল “মা,মারা যাওয়ার আগে দিয়ে গেছে। বলেছিল এটা আমার বাবা আমাকে দিয়েছেন মুখ দেখে।।বাবা আমার নাম অলোকা দিয়েছিলেন।। কিন্তু ওখানে এইসব নামে ডাকে না।।তাই শিউলি”।অসীমা দেবী শিউলির কথা শুনে মাথা ঘুরে পড়ে যান।।সৌরভ এবং তার দুই বন্ধু মিলে অসীমা দেবী কে ধরাধরি করে ঘরে নিয়ে গেলেন,।

জ্ঞান ফেরার পর অসীমা দেবী সৌরভ এবং শিউলি কে পাশে বসিয়ে হাউহাউ করে কেঁদে ফেললেন।। দুচোখ মুছে বললেন “এই লকেট তোর বাবা দুটো তৈরি করে ছিলেন।। আমি জিজ্ঞেস করাতে বলেছিলেন এক পরিচিত কে দেবেন।।তুই হওয়ার পর আমি ভীষন অসুস্থ হয়ে পরি।। তখন উনি প্রায় খারাপ জায়গায় স্বর্ণ নামের একটি মহিলার কাছে যেতেন।।আর শিউলি যদি স্বর্ণর মেয়ে হয় তবে ও তো তোর বোন বাবু।।একই বাবার দুই সন্তান।।ভাই বোনের বিয়ে হয়না কিছুতেই,। এটা হিন্দু মতে অবৈধ।।”

সৌরভ এবং শিউলি দুজনেই বাকরুদ্ধ হয়ে গেল।। কিছুতেই সত্যিটা মানতে পারছিলনা।। ওরা দুজন দুজনকে বড্ড ভালবেসে ফেলেছিল।। তবে উপায়!

পরেরদিন সকালে অসীমা দেবী অনেক ডাকাডাকি পরও সৌরভ নিজের ঘরের দরজা খোলেনা।। শেষে পুলিশ এসে দরজা ভেঙে দুটো নিথর দেহ মাটিতে পড়ে থাকতে দেখে।।সৌরভ এবং শিউলি দুজনেই বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করে।।

একটা কাগজে সৌরভের হাতের লেখা ” মা, আমি বাবার ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করলাম।। শিউলি কে ছেড়ে দিয়ে অন্য কাউকে বিয়ে করলে হয়তো একটা সুন্দর সংসার হতো কিন্তু শিউলি কে তো আবার সেই নরকেই যেতে হতো।। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও”।।।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *