কৃষ্ণ ও রাধিকা প্রেম *********** গীতালি

কৃষ্ণ ও রাধিকা প্রেম
*********** গীতালি
আজ সকালে বসন্ত দূতীর ডাকে চমক ভাঙল, মনে হল বসন্ত এসে গেল নাকি ! কিন্তু কোথায়, শীতের আমেজে শহর এখনো মগ্ন।বসন্তের মেজাজ আসতে মনে হয় কিছু দেরী আছে।হঠাৎ মনে হল সেই দুই নরনারীর শাশ্বত প্রেমের কাহিনী।
বৃন্দাবন বিলাসিনী রাই আর যশোদানন্দন কৃষ্ণ। তাদের জীবনে প্রেম এসেছিল, সমাজের তোয়াক্কা না করে সেই প্রেম কেমন করে চিরকালীন হয়ে উঠেছিল… তারই চিরমধুর কাহিনী।বসন্ত দূতী সেদিনও ডেকেছিল মধুর স্বরে, দুটি হৃদয়কে বেঁধে দিয়েছিল অটুট এক গ্রন্থীতে।দখিনা বাতাসের মাঝে মদনদেব তাঁর পুষ্পধনুনিক্ষিপ্ত বাণটি নিশ্চিত ভাবে এই দুই প্রণয়ীর মাঝে ছুঁড়েছিলেন।দুজনের প্রাণের কথা ব্যক্ত হল নিভৃতে নির্জনে।প্রেমপাশে ধরা পড়ে জীবনের অমৃত সুধা প্রাণভরে গ্রহণ করলেন দুজনে।……..
এ কী হল রাধিকার? বর্ষার ঘনগম্ভীর মেঘ দেখে সংসার ভুলে শ্যামবর্ণ সেই স্মিত হাস্যময় প্রেমিকের কথাই শুধু মনে করেন তিনি।ঐ যে বাঁশি বাজে… প্রাণমন আকুল করা বাঁশির সুরে রাই ব্যাকুল হয়ে ওঠেন।এ আহ্বান তো তাকেই করা হচ্ছে। কিন্তু কী করে শ্যামের কুঞ্জে যাবেন তিনি এই বর্ষণমুখর রাতে? এদিকে আঁধার রাত্রি, অন্যদিকে প্রবল বৃষ্টি মুখরিত প্রকৃতি…..কৈসে যাওয়ব অবলা কামিনী রে? শ্রীরাধিকা তো দমে যাননা। তাঁকে তো অভিসারে যেতেই হবে। প্রেমিকের আকুল আহ্বান তো তাঁর কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল গো…..! কেউ তাঁকে নিবৃত্ত করতে পারে না। রাধা তো প্রিয়সমাগমে যাওয়ার জন্য তৈরী হয়েছেন বাড়িতে ধীরেধীরে। উঠানের মাঝখানে গাগরি বারি ডারি করি পিছল… আর সেই পিছল পথ ধরে পা টিপে টিপে চলা অভ্যাস করেছেন। তবে আর ভয় কী? ঘন নীল বসনে সজ্জিত হয়ে একাকী চলেন রাই অভিসারে। শ্রীকৃষ্ণও প্রিয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে আবেগমথিত সুরে বাঁশিটি বাজিয়েই চলেন, মনে হয় যেন প্রাণপ্রিয়াকে কুঞ্জের হদিশ দেন। সেই সুর লক্ষ্য করে রাধা চলেন প্রিয় অভিমুখে।পথে নানা বাধার সম্মুখীন হয়েও অভিসারিকার চলা থামে না।শেষ পর্যন্ত রাধা পৌঁছে যান কৃষ্ণকুঞ্জে। পরম ভালোবাসায় রাধিকার চরণদুটি নিজের কোলে তুলে নিয়ে একটি একটি করে কাঁটা তুলে দেন তিনি। ক্ষতবিক্ষত পা দুটিকে ভীষণ যত্নে পরিচর্যা করেন কৃষ্ণ।
সোহাগে আদরে দুটি প্রাণ যেন মিলে মিশে একত্রিত হয়ে যায়। পুষ্পিত কুঞ্জবন দুই চিরকালীন প্রেমিকযুগলকে ভালোবেসে ধন্য হয়। ধরাধামের মানুষ এই অপূর্ব প্রেমগাথাকে কেন্দ্র করে ভালোবাসার মর্ম উপলব্ধি করে, কত গান কত কাহিনী রচিত হয়। রাধাকৃষ্ণের এই যুগললীলা চলতে থাকে,বৃন্দাবনের নানা স্থানে।কৃষ্ণ তাঁর মিলন বাঁশিটি বাজাতে থাকেন বারবার, রাধিকা সেই আহ্বান উপেক্ষা করতে পারেন না কখনও…শ্যামকুঞ্জে শ্যামের বাহুবন্ধনে ধরা দিতে ছুটে ছুটে আসেন জগৎ সংসার ভুলে।
তারপর??? তারপর আসে সেই চরম মুহূর্ত ! রাজকার্যে ডাক পড়ে শ্রীকৃষ্ণের। মথুরায় যেতে হবে এবার। রচনা করতে হবে মহাভারত। বিচ্ছেদের বাঁশি তো কৃষ্ণ বাজাতে শেখেননি।কিন্তু এবার প্রকৃতিতেই সেই বাদ্য বেজে ওঠে।আসন্ন বিচ্ছেদের ব্যথায় কেঁদে ওঠে দুই প্রণয়ীর হৃদয়। পরম যত্নে কৃষ্ণ তাঁর প্রিয়ার অশ্রুজল মুছিয়ে দেন।একে অপরের আলিঙ্গনে আবদ্ধ থাকেন। কিন্তু মথুরার রাজা শ্রীকৃষ্ণ তাঁর কর্তব্যের ডাকে এবার সচেতন হন। যেতে হবে তাঁকে।ধীরে ধীরে শিথিল হয় যুগলের বাহুবন্ধন। প্রাণপ্রিয়ার কাছে বিদায় নিয়ে রাজপথের দিকে রওনা হন শ্রীকৃষ্ণ।আর পিছন ফিরে তাকান না। শ্রীরাধিকা? তিনি তাঁর কাজলকালো আঁখির জলে ভাসতে থাকেন। সেই অশ্রুজলেই ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসে প্রিয়তমের অপসৃয়মান দেহখানি।
দুজনের আঁখিবারি গোপনে গেল বয়ে, দুজনের প্রাণের কথা প্রাণেতে গেল রয়ে।
আর তো হল না দেখা, জগতে দোঁহে একা- চিরদিন ছাড়াছাড়ি যমুনাতীরে।।
*********** গীতালি