জীবনবিজ্ঞান সম্পর্কিত কিছু কথা- পর্ব ১০ ✍️ডরোথী দাশ বিশ্বাস

জীবনবিজ্ঞান সম্পর্কিত কিছু কথা- পর্ব ১০

✍️ডরোথী দাশ বিশ্বাস

হ্যাঁ, শিক্ষার্থীদের কাছে আমার একটাই অনুরোধ— পড়ো আর লেখো- ভালোবেসে তাই… সে এক সময় ছিলো, দায়িত্ব বিশাল— হ্যাঁ, আমি মাধ্যমিক পরীক্ষার খাতা দেখার কথা বলছি।

সেদিন বেলা এগারোটা চুয়ান্ন নাগাদ চারদিক কালো করে এলো, প্রবল বাতাস বইতে লাগলো, নিমেষে তাপদহন হ্রাস পেয়ে শীতল অনুভূতি ছড়িয়ে পড়লো প্রাণে। তার আগের দিনই আলিপুর আবহাওয়া দপ্তরের খবর পরবর্তী তেসরা জুনের মধ্যে মৌসুমী বায়ু প্রবেশ করবে বাংলায়। বর্ষার শুভ সূচনা। আর ভাগ্যক্রমে সেই দিনই মাধ্যমিকের ফল। মনে আছে,আমাদের প্রধান শিক্ষিকা (রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত) স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন স্থির করতেন শুভ দিন দেখে। বিজ্ঞানের জয়যাত্রা যখন তুঙ্গে তখন এমন কথার অবতারণা বাতুলতা মাত্র মনে হতেই পারে, তথাপি বিষয়টা যেন এটাই প্রমাণ করতো, ছাত্রীদের জন্য কতটা উৎসর্গীকৃত প্রাণ ছিলেন তিনি। এবারে আসি খাতা দেখা প্রসঙ্গে। মার্কস ফয়েলের সাথে খাতার ক্রমিক সংখ্যা মিলিয়ে পঁচাত্তরটি উত্তরপত্রের প্রথম লট খুললাম। সব ছেলেদের খাতা। প্রথমেই পরীক্ষকের সই সেরে ফেললাম। সাথে সাথে বেড়ে গেলো আরো দায়িত্ব ও যথারীতি নিরাপত্তা ব্যবস্থা। প্রশ্নপত্রের সাথে মিলিয়ে ইংরেজীতে লেখা নির্দেশাবলি পুঙ্খানুপুঙ্খ পড়ে নিলাম। প্রত্যেক বছর পরীক্ষার পরই না চাইতেই হাতে প্রশ্নপত্র পেয়ে যেতাম। স্কুল চলাকালীন প্রামাণ্য উত্তরপত্রও একটা তৈরী করে ফেলতাম। পরবর্তীতে স্কুলের মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের কাজে লেগে যেতো। কিন্তু এবারে সেটা পাইনি। চাইও নি। অতএব, উত্তরপত্র তৈরিও করিনি। ভাবলাম, আগে একটু পড়াশুনো করে নিই। তাই সময় নষ্ট হবে জেনেও নির্দেশাবলি ও তিনটি টেক্সটবুক সামনে রেখে তৈরি করে ফেললাম প্রামাণ্য উত্তরপত্র। বাড়ির সদস্যরা মাঝে মাঝে এসে দেখে যাচ্ছে, জিজ্ঞেস করছে কয়টা দেখা হলো? আমি গম্ভীরস্য গম্ভীর। কখনো বা বলছি, আগে প্রশ্নের সমাধান করি। তারপর শুরু করবো। গেলো একটা দিন। পরদিন শুরু না করলে টেনশন বাড়বে ক্রমশঃ। এতো প্রস্তুতি নিয়ে প্রথম খাতাটা দেখলাম। পৌনে দু’ঘন্টা লাগলো। কেন লাগলো? এক কথায় বলতে পারবো না। ছেলেটি চারটি লুজ শীট নিয়েছে, ৮৬/৯০ পেয়েছে। পরের খাতাগুলো এক ঝলক দেখলাম, এই লটে প্রায় সব খাতার বেধ বা ভ্যলিয়ুম একই। মানে লিখে গেছে তারা। মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হয় সকাল ১১:৪৫, শেষ হয় বিকেল ৩:০০ টায়। জীবনবিজ্ঞান প্রশ্ন হলো ১৫ পাতার। প্রশ্ন ভালো করে পড়ার জন্য ১৫ মিনিট সময়। কিন্তু আমার পরীক্ষাকেন্দ্রে দেখেছি এরা সেটা না করে বন্ধুরা পরস্পর কথা বলতেই ব্যস্ত। পরীক্ষাহলের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকের নির্দেশ মানে না। কি যুগ এলো!!! অভিভাবকরা পই পই করে শেখাবেন সহবত। নির্দেশ না মানার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে গৃহপরিবেশ থেকে। শিক্ষক বুঝিয়ে বলবেন অবশ্যই। শাসন তো করবেন না। কখনোই না। আজ ২৫ বছর ধরে মাধ্যমিকের খাতা দেখার অভিজ্ঞতা। যত দিন যাচ্ছে মেধাবী ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ মেধার বিকাশ হচ্ছে। সত্যিই কি মেধার বিকাশ হচ্ছে? মেধার বিকাশ যদি সত্যিই হয় তাহলে সব মেধাবীরা কেন প্রতিষ্ঠিত নয়? কেন একজন উজ্জ্বল স্থপতিবিদকে আবার নতুন করে এম বি এ পড়তে হয়? কেন একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নশাস্ত্রের টপারকে নতুন করে টাকা ঢেলে কোচিং নিয়ে ব্যাঙ্কের চাকুরীর প্রস্তুতি নিতে হয়?
প্রাপ্ত নম্বর দিয়ে মেধার মান নির্ণীত হতে পারে না। কিভাবে নম্বর ওঠে, সেটা ছাত্র, অভিভাবক বা জনসাধারণের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। যেমন জীবনবিজ্ঞানের কথাই বলছি: ৩৬ টি প্রশ্ন আছে যাদের প্রত্যেকটির মান ১,, ১৭ টি প্রশ্ন আছে, যাদের প্রত্যেকটির মান ২, এর মধ্যে উত্তর করতে হবে ১২টির, ঐ যে ২- সেই ২ কে নির্দেশিকায় চারটি প্রশ্নের ক্ষেত্রে ভাগ করা হয়েছে (১/২+১/২+১/২+১/২) করে, ১২ টি প্রশ্নের প্রত্যেকটির মান ১+১, মাত্র ১টি প্রশ্নের মান ২,,সবচেয়ে সুবিধা হলো প্রশ্নে মেন্ডেলের সূত্রতে নম্বর আছে ২, কিন্তু নির্দেশিকায় সেটা করা আছে ১+১,পরীক্ষককে একদম নির্দেশিকা অনুসরণ করতেই হব, অর্থাৎ যদি এমন হয়, একটি ছাত্র কোনক্রমে সূত্রের প্রথম অংশটুকু লিখেছে আর শেষটা লিখতে পারেনি বা যদি উল্টোটা ধরি, প্রথম অংশটি গোঁজামিল দিয়ে শুরু করে শেষ অংশটি সঠিক লিখেছে সেক্ষেত্রে পরীক্ষক তাকে ১+০ বা ০+১ দিতে বাধ্য, যা আমরা স্বপ্নেও ভাবতে পারি না। ৬টি প্রশ্ন এবং তাদের বিকল্প প্রশ্ন মিলিয়ে মোট ১১টি প্রশ্ন আছে, যাদের মান ৫, কিন্তু সেখানেও ৭টি প্রশ্নের মান (৩+২) করে, আর চারটি প্রশ্নের প্রত্যেকটির মান ৫,, তো বলুন, নম্বর পাবে না কেন। পরীক্ষার্থীরা উত্তর লেখার ক্ষেত্রে যদি একটু যত্নবান হয়, সেটাই কাম্য। যেমন: জীবনবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ১ নং প্রশ্নের সব অর্থাৎ ১৫ টি প্রশ্নের উত্তর লেখা হলে খাতায় একটু জায়গা ছাড়তে হবে। ২নং প্রশ্নের সব অর্থাৎ ২১ টি প্রশ্নের উত্তর নির্দেশ অনুসারে লেখার পরও খাতায় একটু জায়গা ছাড়তে হবে। ৩নং প্রশ্নের সব অর্থাৎ ১২ টি প্রশ্নের উত্তর লেখার পর খাতায় একটু জায়গা ছাড়তে হবে। ৪নং প্রশ্নের ৬টি উত্তর দিতে হবে। তবেই শেষ। কেন এই জায়গা ছাড়ার কথা এলো? পরীক্ষক Caging করেন, তাই। প্রত্যেকটি প্রশ্নের শেষে Caging. স্কেল বসিয়ে লাল কালি দিয়ে টেনে সেখানে নম্বর বসিয়ে Caging. আজকাল প্রায় সব পরীক্ষার্থীই বিকল্প প্রশ্নেরও উত্তর লিখে রাখছে। আবার ছয়টি প্রশ্নের মধ্যে যেকোন পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দিতে বললেও ছয়টি প্রশ্নের উত্তরই দিয়ে রাখছে। কেন এমন প্রায় সবাই? Casing system আছে, সুতরাং বেশি লিখলে অতিরিক্ত নম্বর তো যোগ হবার সুযোগ নেই। Casing এ ফেললেই অতিরিক্ত প্রশ্নের উত্তর করা হয়েছে বুঝতে পারবেন পরীক্ষক। সেক্ষেত্রে অবশ্য পরীক্ষক সব উত্তর দেখেই নম্বর দেবেন, যে প্রশ্নে বেশি নম্বর উঠেছে, সেটা গ্রাহ্য হবে, অন্যসব অতিরিক্ত প্রশ্নের উত্তর হিসেবে চিহ্নিত করে দেবেন। সত্যিই বুঝতে পারি না কেন সব উত্তর লেখার প্রবণতা। তবে কি মেধার ভিত্তিতে চিহ্নিত প্রথম সারির ছাত্রদের আত্মবিশ্বাসের অভাব? এমন তো হওয়ার কথা নয়। না কি পরীক্ষকের চোখকে ফাঁকি দেবার চেষ্টা। সে গুড়ে বালি। কারণ Casing system. তবে কেন প্রশ্নপত্রের উপরে প্রদত্ত নির্দশাবলি ভালো করে পড়ে না? সেজন্যই তো ১৫ মিনিট অতিরিক্ত দেওয়া। কোথায়, কোন ইনস্টিটিউশনে শেখানো হয়, যে ছয়টির মধ্যে যে কোন পাঁচটি বা আটটির মধ্যে যে কোন ছয়টি বা সতেরোটির মধ্যে যে কোন বারোটি যাই প্রশ্নে চাওয়া হোক না কেন, সব লিখে আসতে হবে? নির্দেশ না মানার প্রবণতা এভাবেই তৈরি হয়। এমন আচরণ আত্মবিশ্বাসের অভাববোধই সূচিত করে। অধিকাংশ ছাত্রই কোন্ প্রশ্নের উত্তর লিখছে জানা যায় না। হয়তো উত্তরের পাশে কোন প্রশ্ন নম্বর দেবার কথা মনেই থাকে না তাদের। তাইই বা কেন, কেন মনে থাকবে না? পরীক্ষক ভালোই বুঝতে পারেন, প্রশ্ন নম্বর ছাড়াই কেন এই শুধু ঢালা উত্তর লিখে রেখে যাওয়া। যাই হোক্, সঠিক উত্তর হলে তো কোন সমস্যা নেই, যদি ভুল বা যা খুশি লিখে রাখা বিষয় থাকে, পরীক্ষক সেখানে উত্তরের ধাঁচ বুঝে লাল কালি দিয়ে যত্ন করে প্রশ্ন নং বসিয়ে দেন। কারণ Casing করতে হবে তো। এভাবে সুন্দর করে সেজে ওঠে উত্তরপত্র। এমনও দেখলাম এবার, প্রশ্ন নং ৩.৫ না ৩.৬ – কি লিখেছে সেটা বোঝা মুশকিল। ৫ আর ৬ এর মাঝামাঝি একটা ভ জ ঘ ট ডিজিট। ঐ আগের বা পরের কোন সতীর্থের খাতা দেখে লেখা আরকি। লুজ শীট নেয়নি, অথচ সুতো বেঁধেছে মূল উত্তরপত্রে। কি সাবধানী!
প্রথমে বিষয়, তারপরে নাম লিখতে হয়। প্রথম দিন ইনভিজিলেটর অবশ্যই পরীক্ষা হলে নির্দেশ দিয়ে থাকেন। সেখানে ভুল হবার কথাই নয়, অথচ দেখলাম যেখানে জীবনবিজ্ঞান পরীক্ষার আগে আরও চারটে বিষয়ের (বাংলা, ইংরেজী, ভূগোল, ইতিহাস) পরীক্ষা হয়ে গেছে সেখানে পরীক্ষার পঞ্চম দিনেও কি করে এরা বিষয়ের ঘরে নিজের নাম আর নিজের নামের জায়গায় বিষয় লিখে পরে সেগুলো হিজিবিজি করে কেটে আবার কোনক্রমে ঠিক লিখে রাখে? এতো কিসের অস্থিরতা? কেন এটুকু সিনসিয়ারলি লিখতে যত্নবান নয় এরা? পরীক্ষা দিতে এসে কোন দিকে মন? অথচ দেখলাম তারাই আবার এতো বেশি সাবধানী, অবিশ্বাসীও, যে খাতায় একটা লুজ শীট নিয়ে সুতো তো বেঁধেইছে, এটাই নিয়ম, তারপরেও খাতার উপরে মাঝে শেষে এমন ভাবে তিনখানা পিন মেরেছে যে সরু করে টানা মার্জিনের তো কোনো অস্তিত্বই নেই, এমনকি যা লিখেছে সেসবও পিনের অন্তরালে। পরীক্ষকের নম্বর বসাতে খাতার ডান, বাম, উপরের অংশ প্রয়োজন। ছাত্রসমাজকে বন্ধুর মতো গাইড করা সত্বেও তারা সেসব নেয় না। যাই হোক, সময় লাগে লাগুক, ধৈর্য্যসহকারে পরীক্ষক আরো বেশী করে যত্নবান এসব খাতার ক্ষেত্রে।
পরীক্ষার্থীরা সকাল১১:৪৫ – বিকেল ৩:০০ এতো সময় পায় যে ওরা প্রায় সবাই (৭৫ এর মধ্যে ৬৫ জনই) প্রশ্ন লিখেছে কালো কালি দিয়ে ও উত্তর লিখেছে নীল কালি দিয়ে- এতে কার কি এসে যায়! বরং প্রশ্ন নম্বর দিয়ে উত্তর লেখাটাই তো রীতি। এর জন্য তিন চারটা করে লুজ শীট নিতে হচ্ছে, এতগুলো পৃষ্ঠা নিয়েছি, এটাই বুঝি আত্মতুষ্টি! এইভাবে আত্মতুষ্টি লাভের চেষ্টা না করে সঠিক রীতিতে লিখে নম্বর তোলার দিকে যত্নবান হতে হবে রে বাবা। যেহেতু শিক্ষা মানেই টেট্রাপোলার সিস্টেম, তার মধ্যে সরকার, শিক্ষার্থী, শিক্ষক ছাড়াও অভিভাবক একটি মেরু। উত্তর লেখার আগে সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের প্রশ্ননং বসাতে হবে- এটা দশ বছরে চেষ্টা করেও শেখাতে পারিনি ধরে নিচ্ছি। এটা শিক্ষককুলেরই ব্যর্থতা। অভিভাবকরা যদি একটু যত্নবান হন, তাহলে নিশ্চয়ই ওরা শিখবে। পরীক্ষক তো ভীষণ যত্নবান। যে ছেলেটি নব্বইতে ছিয়াশি পায়, কোথায় তার চার নম্বর কাটা গেলো সে ব্যাখ্যা ঐ খাতাতেই লাল কালি দিয়ে উপযুক্ত মন্তব্য দ্বারা দিয়ে রাখেন। সেক্ষেত্রে খাতা চ্যালেঞ্জ হলে এক্সামিনারকে নিয়ে টানাটানি না করেও সঠিক মূল্যায়ণ হবেই।

ক্রমশঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *