#দোল © মোনালিসা সাহা দে

#দোল
© মোনালিসা সাহা দে

– বলি তোদের লড়াই কি আর থামবে না? ভাই তো তোর থেকে ছোট, ওকে এত মারিস কেন?

রুমকি-পিন্টুর মার গলায় ঝরে পড়ছে ক্লান্তি। সকালে ঠিকে কাজগুলো সেরে এসে দুটো শাক ভাত মুখে দিয়ে সবে শুয়েছে সে। এখন আবার শুরু হলো এই এক অশান্তি।

– তাই বুঝি? শুধু আমিই মারি? আর ও আমাকে মারে না? তুমি কি চোখে দেখতে পাও না? এই দেখো আজ সকালে আমি পাউরুটি খাচ্ছিলাম বলে আমাকে কেমন করে খামচে দিয়েছে।

পিঠে আঁচড়ের দাগ দেখালো রুমকি।

– ইস রে! আমি তোদের দুজনেরই কষ্ট বুঝি। দু বেলা দুটো ভালো খাবার যদি দিতে পারতাম! এ বাড়ি ও বাড়ি কাজে কতই বা জোটে! তোর বাপের ধার-দেনা মেটাতেই তো সব চলে যায়। সে ব্যাটা গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়ার আগে আমাদেরকেও ডুবিয়ে দিয়ে গেল। তা তুইই বা পাউরুটি থেকে ভাইকে একটু ভাগ দিলি না কেন?

– কেন দেব? ও তো সকালেই দুধ-মুড়ি খেয়েছিল মা। তাছাড়া এ পাউরুটি তো স্কুল থেকে কাল আমাকে দিয়েছিল। জমিয়ে রেখে সকালে খেয়েছি। সবসময় কি আমিই সব ছেড়ে দেব?

রুমকি এবারে কাঁদতে লাগলো।

– আচ্ছা আচ্ছা, এখন চুপ কর। ও দিকে দেখ, পিন্টু এখনও কাঁদছে। মেলা ঘ্যান ঘ্যান আর ভাল্লাগেনা বাপু। ঘরে চিড়ে নেই একটুও। এই দশ টাকা নে। কিনে নিয়ে আয় তো।

রুমকি বেরিয়ে যায়। রুমকির মা দু চোখ মোছে আঁচলে। মাঝে মাঝে মনে হয় আগের সময়টাই হয়তো ভালো ছিল।
কিন্তু সত্যিই কি তাই? না না! তাহলে এতো দেনা হলো কেমন করে? ভুলে গেলে কি চলবে সেই অত্যাচার? এখন তো শুধুমাত্র অভাব আছে। তখন তো অভাব আর স্বভাব, দুটোই ছিল একসঙ্গে।

ভোলা কি যায় সে সব দিন? সে লোক তিন মাস অন্তর ঘরে ফিরে এসে শুধুই আয়েস করত। কবেই বা দায় নিয়েছে সে? কেলান্ত শরীরে রোজ রাত্তিরে নেশা ভাঙ আর জবরদস্তি। গলা অব্দি মদে ডুবে থাকা। মুখে নোংরা ভাষা। মানতে না পারলেই রোজ রোজ মারধর! কি ভয়ানক দিনই না কেটেছে। শাঁখা-সিঁদুরটুকু আগলে ধরে কোনমতে দিন গুজরান।

তারপর? একদিন ব্যাটার পেটের ভেতরে শুরু হলো তেমনি জ্বালা! শরীরের উপর অত্যাচার করলে শরীরও পাল্টা শোধ নেবে বৈকি। এত কষ্ট সহ্য করতে পারেনি সে, দড়িকে নিলো আপন করে। কিন্তু মাঝের দিনগুলোতে তাকে সারিয়ে তুলতে খরচ হয়ে গেছিল জমানো টাকা টুকুও। পরে জানা গেল বাজারে আরও অনেক দেনা। সেদিনের দেনা এখনো মিটিয়ে চলে চলছে সে। কতটা সত্যি, কথাটা মিথ্যা সবটা জানে না রুমকির মা। শুধু এটুকু জানে যে এ সমাজ মোটেই ভালো না। একলা মেয়েমানুষ দেখলেই তারা ঝাঁপিয়ে পড়ার অপেক্ষায় থাকে। এই দু বছরে ইনিয়ে বিনিয়ে কত যে ইশারা সে পেয়েছে!

একে তো এখানকার লোকজন ভালো নয় একটুও, তার উপর নিয়ম আচার বড়ই বেশি। আগে সে বারো কালে হলেও আমিষটুকু খেত আয়েস করে, পরনের কাপড় ছিল ঝলমলে রঙিন। আর এখন? নিজের বাড়িতে কদিনই বা ভালো রান্না হয়, কোনোদিন হলে না হয় রান্নাঘরে দোর দিয়ে সে চেটেপুটে সবই খায়, কিন্তু কোনো ভোজবাড়িতে যাওয়ার সুযোগ পেলেও মন ভরে খাওয়ার সুযোগ নেই। এই অজপাড়াগাঁয়ে নিয়ম নীতি মানতে মানতেই সে নাজেহাল। ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়। পুরনো শাড়িগুলো পরারও উপায় নাই। একদিন তো জানলা দিয়ে রুমকি দেখে নিয়েছিল তার মা ঘরে দোর দিয়ে রঙিন শাড়ি পরে আয়নায় নিজেকে দেখছে। যদিও সে কাউকে বলেনি কিছু, মা চোখ পাকিয়ে মুখ বন্ধ রাখতে বলে দিয়েছিল।

ঐটুকু মেয়ে কিছু কি আদৌ বুঝতে পেরেছিল?

**

মায়ের দেওয়া দশ টাকা হাতে নিয়ে রুমকি যাচ্ছে পাড়ার দোকানের দিকে। না না, কাজটা মোটেই ঠিক করেনি সে। ছোট্ট ভাই। কত ভালবাসে সে তাক। ঝোঁক উঠে গিয়েছিল, মেরে দিয়েছে আচমকাই। যদিও ঠোকাঠুকিটা রোজকারই ব্যাপার, তবুও ভাইকে মারলে তার নিজেরই কষ্ট হয়।

আজ দোল। চারিদিকে সবাই রং খেলছে। সে নিজেও বিকেলে রং খেলবে বন্ধুদের সঙ্গে, মনে মনে ভেবেই রেখেছে, যদিও রঙ কেনার টাকা মা তাকে দেয়নি। মার কাছে মনে হয় আর টাকা নেইও। তাই মা শুধু চিড়ে কিনতেই টাকা দিয়েছে। কিন্তু মা জানে না রুমকি একদিন স্কুল কামাই করে শুকনো পাতা কুড়িয়েছিল সারা দিন। সেটা বিক্রি করে যে টাকা পেয়েছিল তা লুকিয়ে রেখে দিয়েছে আজকের দিনের জন্য। রং কিনতে হবে যে! সেই টাকাটুকুও সে আজ চুপিচুপি নিয়ে এসেছে দোকানে।

দোকানে গিয়ে কিছুক্ষণ থম মেরে দাঁড়িয়ে থাকে রুমকি। মা কষ্ট করে টাকা জমিয়ে তাকে পড়াচ্ছে, আর সে কিনা স্কুল কামাই করলো মাকে না জানিয়ে। মা জানতে পারলে কত দুঃখ পাবে! মায়ের মনে তো এমনিতেই কত কষ্ট। আগে কি সুন্দর বড় বড় টিপ পরতো মা। এখন তো মায়ের টিপ পরা বারণ, ঝলমলে রঙিন শাড়ি পরাও বারণ। কী যে সব নিয়ম তা রুমকি জানে না। সে শুধু এটুকু জানে যে মা ঘরের মধ্যে দরজা বন্ধ করে বাক্স থেকে পুরনো এক রঙিন কাপড় পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। এখন আর মায়ের কাছে কোনো টিপ নেই। কেন নেই? এমন অনেক ‘কেন’ মনে জমে আছে তার।

পাড়ার মুদির দোকানে আজ বড্ড ভিড়। নানা রঙের আবির আর রং সাজানো আছে। এ পাড়ার একমাত্র দোকান তো, টুকটাক সবকিছুই পাওয়া যায় এখানে কিনতে।

– দশ টাকার চিড়ে দাও তো কাকু।

– একটু অপেক্ষা কর, দিচ্ছি।

রংও কিনতে হবে, কিন্তু আগে লোকজন কমুক, তারপর। এমনিতেও গরিবদের সারা জীবন অপেক্ষাই করতে হয়।

চিড়ে কেনা হয়ে গিয়েছে, এবারে রং কেনার পালা। কিন্তু মনটা আবার কেমন খচখচ করছে । কি করবে সে! রং কি আদৌ কিনবে? ভাইয়ের তো আবার রং আবির মাখলেই গায়ে চুলকানি বেরোয়। আর মা? মাকে তো একটা রঙিন শাড়ি পরতে গেলেও লুকাতে হয়! তাহলে?

পুরো দোকান ঝলমল করছে নানা রকমারি জিনিসে। এক মন দিয়ে রুমকি সে সব দিকে চেয়ে।

**

বাড়ি ফিরেছে রুমকি। বিকেল বেলায় বন্ধুরা ডাকতে এসেছিল, কিন্তু সে আজ বেরোয়নি। দোল খেলার ইচ্ছা তার নেইকো মোটেই।

– লাল রঙটা কিন্তু আমার দিদি। হলুদটাও।

– ঠিক আছে ভাই আমার, আজ সবটাই তোর জন্য।
ভাই -এর মুখে হাসির ঝর্ণা দেখে রঙিন আজ রুমকির মুখও।

দুটো কচি মানুষ যেন দুটো রঙিন প্রাণ। বেচারা পিন্টুর জিভ এসব রকমারী স্বাদ পাওয়ার সুযোগই পায়নি কোনোদিন।
নিষ্ঠুর দিদি, নাকি মাতৃত্বের সুপ্ত রূপ?

পিন্টু রঙিন হচ্ছে। সামনের থালায় ছড়ানো ছিটানো নানা রঙের রকমারি পপিন্স লজেন্স।

তাদের মা তখন পাশের ঘরে বসে চোখ মুছছে। আজ যে বড় আনন্দের দিন। তার নিজের মেয়ে তার মনকে বুঝেছে, এর থেকে বড় খুশির কি কিছু হতে পারে!

একটু পরে তাদের মা বাক্স থেকে রঙিন শাড়ি বের করে পরে মেয়েদের সামনে দাঁড়ালো। রুমকি মায়ের জন্য নানা রঙের টিপের পাতা কিনে নিয়ে এসেছিল। কপালে চন্দন পরানোর মতন করে টিপ পরিয়ে দিলে সে মাকে। তার নিজের জন্য মেলা থেকে কিনে রাখা লাল টুকটুকে লিপস্টিক বের করে সে বাক্স থেকে। মায়ের ঠোঁট রাঙিয়ে দেয় নিজে হতে। কী সুন্দর দেখাচ্ছে মাকে আজ। রুমকি আগেই সদর দরজার হুড়কো তুলে দিয়ে এসেছিল। কেউ যেন দেখতে না পায়! তার মা আজকের দিনটা এমন রঙিনই থাকবে। ব্যস আর কটা দিনের অপেক্ষা। যেদিন রুমকি বড় হবে সেদিন এখান থেকে মাকে আর ভাইকে নিয়ে অনেক দূরে চলে যাবে। তখন আর মাকে লুকিয়ে লুকিয়ে সাজতে হবে না, মা সবকিছু খেতেও পাবে।

আজ দোলযাত্রা। তাদের ঘরে রঙের সমাগম। সাত রঙের সমাহারে রামধনু রূপে সজ্জিত এই টুকরো খুশির দোল।

****

© মোনালিসা সাহা দে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *