আজ আমি তাদের কথা বলছি —— গীতশ্রী সিনহা

আজ আমি তাদের কথা বলছি ——
গীতশ্রী সিনহা
লোকাল ট্রেনের কামরায় শব্দেরা উচ্চস্বরে মগ্ন কথায় ! দু’জন অন্ধ মানুষ বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন অর্থের সন্ধানে আমাদেরই মতো! স্বপ্ন অপছন্দ হলে পুনরায় স্বপ্ন দেখবার নিয়ম হয়েছে আজকাল! মানুষ মরছে প্রতিদিন… মানুষ বেঁচে আছে আজও ভুল স্বপ্ন সাজিয়ে !
অর্থের প্রয়োজন কার নেই বলুন তো ! যাক গে, দু’জন অন্ধ মানুষের কথা বলছিলাম লোকাল ট্রেনের কামরায় ! প্রথম জনের কথা বলি… বয়স আনুমানিক পঁচিশ, সুঠাম চেহারা। গায়ের রঙ উজ্জ্বল। শুধু ঈশ্বর তাঁকে উচ্চতা দেবার সময় যথেষ্ট কার্পণ্য করেছেন… দেননি দৃষ্টিও… হয়তো জানাতে চাননি পৃথিবী আসলে গিরগিটিদের একচ্ছত্র বাসস্থান ! অপলক তাকিয়ে থেকে ভাবছিলাম ঠিক কেমন ছিল তাঁর শৈশব… ঠিক কোন পরিস্থিতি এভাবে তাঁর কাঁধে ঝুলিয়ে দিলো কিশোর কুমারের রেকর্ড করা কিছু গান ধরা এক বাক্স! হাতে তুলে দিলো ভিক্ষাপাত্র… দাতা কর্ণের
মতো না হলেও, বেশ অনেকেই তাঁকে দান করেছেন।
আর আমার ! এরকম দৃশ্য দেখে বাতাস অসহ্য হয় বুকের ভিতরে আলো হারানো কশা অভিমানে !
এরপর কেটে যায় নিকষ বৃত্তের থেকে চোখ দুটো ঘোরে পাপোশে লোটানো ভাবনায় !
ততক্ষণে অন্ধ তরুণ অন্য কামরায়… আরও দয়াবান কিছু মানুষের অনন্ত দর্শনে !
পরবর্তী স্টেশন থেকে উঠে আসে আরও একটি অন্ধ শরীর ! মনে পড়ে গেল, “এভরি থার্ড থট ইজ মাই কিলার”… প্রথম জনের চেয়ে অনেক বেশি শোচনীয় তাঁর অন্ধত্ব… শীর্ণকায়, ছেঁড়া নোংরা একটা জরাজীর্ণ অপোক্ত শরীর ! পা দু’খানা টলমলে খোঁড়া… ওর এক হাতে লাঠি, আর অন্যহাতে… না না, ভিক্ষাপাত্র না…! ইঁদুর মারার ওষুধ ! ভারী গলায় বলতে লাগলো —- ” দিদিরা দাদারা… মাত্র পাঁচ টাকায় ইঁদুর মারুন… মাত্র পাঁচ টাকায়…” একটাও বিক্রি হলো না এই কামরায়… হয়তো কারও বাড়িতে ইঁদুর নেই… খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে “গট গট” সে রওনা হলো পরের কামরার দিকে… তখনও ভেসে আসছিল কিশোর কুমারের গান… কিন্তু আমার কানে বাজছিল, “মাত্র পাঁচ টাকায়… ”
কাঁটা চামচ দিয়ে ছিঁড়ে ছিঁড়ে সময় কে বিচার করতে শিখছি তখন ! ততক্ষণে হারিয়েছি আমার নিজস্ব প্রস্থান পথ ! তবু, পাঁচ টাকায় আজ নতুন “স্বপ্ন” পড়তে শিখেছি !